কৃষ্ণপক্ষের দ্বিতীয় প্রহর

 

রাতের খাবার খেয়ে বোনের বাড়ি থেকে বের হতে হতে রাত আটটা পার হয়ে গেল ঢাকা কিংবা শহরাঞ্চলে রাত আটটা তেমন কোন রাতই নয়। কিন্তু ডিসেম্বরের শীতের রাতে ভারত বাংলাদেশ সিমান্তে নদীর কোল ঘেঁষা ছোট্র এই জনপদে এটা বেশ ভালোই রাত। ওখান থেকে শহরে আমার বাড়ির দূরত্ব প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার।

 

নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করে চলে যাবো। প্রথমে কিছুটা গ্রামীন সড়ক তারপরই ন্যাশনাল হাইওয়ে। পুরোটাই পাকা রাস্তা, তাই তেমন কোন চাপ নেই। বোন-দুলাভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বের হতে যাব, তখনই অনার্স পড়ুয়া ভাগ্নী  দৌড়ে এল।

 

মামা, আমার এক রুমমেট-বান্ধবী বেড়াতে এসেছে দু-দিন আগে, সকাল বেলা ওর টিচারের কাছে পড়া আছে। জেলা শহরে আপনার পাশের মহল্লাতেই ওর হোষ্টেল, ওকে কি আপনার গাড়িতে নিয়ে যেতে পারবেন?

 

বেশ খানিকটা মেজাজ খারাপ হলো। একাকী রাতের বেলা গান শুনতে শুনতে আর গাড়ির উইন্ডশিল্ডে ধুম্রশলাকার লাল আলোক বিন্দুর প্রতিফলন দেখতে দেখতে মনের মত ড্রাইভ করবো হাইওয়েতে। তা আর হলো না। অনিচ্ছা সত্বেও রাজি হলাম, আবারও সোফায় বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম।

 

মিনিট দশেক পর ভাগ্নীর সাথে এক শ্যামাঙ্গী সুবেশী তন্বী  বেরিয়ে এসে কোন রকম সম্বোধন না করেই বলে উঠল, চলেন যাই।

 

আমি একই সাথে বিষ্মিত কিছুটা রাগও হলো। কেমন মেয়ে! সালাম বিনিময়, আদব-কায়দা সব উঠে গেল নাকি এই জেনারেশন এর মাঝ থেকে। আবার মনে হলো হয়তো ঠিকই আছে। এই জেন জি নাকি সবকিছুকে শর্টকাট করে ফেলেছে। এরা সিনেমা দেখে দ্বিগুন গতিতে, কয়েকটা গান একসাথে ফিউশন বানিয়ে তারপর শোনে। এদের সাথে আমরা মিলেনিয়াল জেনারেশন তাল মেলাতে পারবো না, সেটাই হয়তো স্বাভাবিক। 

 

মেয়েটাকে তার তার হোষ্টেলে ভালোভাবে পৌঁছে দেয়ার নির্দেশ আর সাবধানে গাড়ি চালানোর করার একগাদা পরামর্শ বোনের কাছ থেকে মাথার উপর নিয়ে স্টার্ট করলাম।

 

গ্রামের ভেতরের ঘোরানো প্যাঁচানো রাস্তা ধরে এসে ছোট গ্রামীন বাজারটায় পৌঁছে দেখি সবগুলো দোকানই বন্ধ। গাড়ির হেডলাইটের উজ্জ্বল আলোটা বিশাল বট গাছের একটা বিশালতর ধাবমান ছায়া তৈরি করল পেছনের দোকানগুলোর গায়ে। একটা মানুষও চোখে পড়লো না স্থানীয় বাজারটায়। একটা শুনশান নিরবতা চারদিকে। চেনা পথ ধরে চলছিলাম হাইওয়ের দিকে।

 

পাশে বসা তরুনী এবার মুখ খুললো। আমার সাথে যেতে চেয়ে আমাকে বিপদে ফেলে দিয়েছে এই টাইপ কথাবার্তা। যা শুনে স্বভাবতই আমার মেজাজ খারাপটা আরেকটু বেড়ে গেল। আমার একাকিত্ব ভঙ্গের জন্য মনে মনে একটা গালিও দিলাম। কিন্তু মুখে বললাম, না না আমি কিছু মনে করিনি। ভালোই তো হল গল্পে-গল্পে যাওয়া যাবে এতটা পথ।

 

কথায় যেন মুখের আর্গল খুলে গেল তরুণীর। বলল, খুব মন খারাপ নিয়ে বান্ধবীর বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলাম। যদি সেদিন এখানে না আসতাম তাহলে হয়তো সুইসাইড করতাম।

 

কথা শুনে বুঝলাম হৃদয় ঘটিত কোন ব্যাপার নিশ্চয়ই। এই বয়সে যা হয় আর কি। সবকিছুই ভালো লাগে, আগুন জ্বলা প্রেমে পড়ার বয়স ওদের।

 

তারপর, কত কথা! বাঁধ ভাঙা বেনো জলের মত ভেসে আসছিল কথারা। তরুনীর হৃদয় থেকে উঠে আসছিল যেন আপনা-আপনিই।  গাড়ির ষ্টিয়ারিং হুইলে হাত রেখে রাতের হাইওয়ের মাঝ বরাবর কাটা কাটা সাদা দাগ ধরে মনোযোগ দিয়ে ড্রাইভ করছি মাঝারি গতিতে। মাঝে মাঝে কোন বেরহম ট্রাকের হাইবিমের আলোতে চোখ ঝলসে যাচ্ছে। খুব বিরক্তি লাগছে তখন। তবে পাশের আসন থেকে কান্না জড়ানো কন্ঠে ভেঙে যাওয়া প্রেমের স্মৃতি চারণ শুনতে খারাপ লাগছিল না একেবারেই। কখনও কখনও দুয়েকটা প্রশ্ন করে ওকে বোঝাচ্ছিলাম যে আমি একজন খুবই মনোযোগী শ্রোতা। তরুণী দুয়েকবার অবশ্য জিজ্ঞেস করেছিল, আমি বিরক্ত হচ্ছি কিনা? এক বাক্যে জবাব দিয়েছি, আরে বলো তো। আমার শুনতে ভালো লাগছে। আমি আসলে বুঝতে পারছিলাম, কথা বলতে তার ভালো লাগছে, মন হালকা হচ্ছে। আসলে কখনও কখনও মানুষের কথা বলার সুইচটা অন হয়ে গেলে কথা চলতেই থাকে। হয়তো বিশেষ কোন পরিবেশ বা কোন নির্ভরযোগ্য কোন মানুষের কাছেই কথার রকেট যেন এক মহাকাব্য হয়ে পাড়ি দেয় মহাশুন্য অভিমুখে। 

 

প্রায় অর্ধেক পথ পার হয়েছি। হঠাৎ করেই সামনে দেখি ট্রাকগুলো থেমে আছে। বিপরীত দিকের কোন গাড়িও আসছে না। প্রমাদ গুণলাম। রাতের হাইওয়ের জ্যাম। না জানি কপালে কি আছে! সামনে থেকে আসা এক ভ্যানচালক পরামর্শ দিল, গাড়ি ঘুরিয়ে বাঁ পাশের ছোট রাস্তা দিয়ে নেমে যান, পর পর দুবার ডানে মোড় নিলেই আধা ঘন্টার মধ্যেই অন্য আরেকটা বড় রাস্তা পাবেন, আর ওটা ধরে সোজা শহরে চলে যেতে পারবেন। জ্যামে ছাড়ার অপেক্ষায় না থেকে গাড়ি ঘোরালাম দ্রুত ফেরার তাগিদে। আবার গ্রামীন সরু রাস্তা। তবে পার্থক্য হচ্ছে এই রাস্তায় তেমন ঘরবাড়ি দেখা যাচ্ছে না, অধিকাংশই ফাঁকা মাঠের ভেতর দিয়ে গেছে। রাস্তার দু-পাশে বৃটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানীর লাগানো ইপিল-ইপিল গাছের সারি। তরুনী হটাৎই চুপ করে গেছে। মুখের দিকে তাকিয়ে একটু যেন চিন্তিত মনে হল। আমি অভয় দিয়ে বললাম, টেনশন করো না দ্রুতই বড় রাস্তায় পৌঁছে যাবো।

 

গাড়ি চলছে তো চলছেই, বড় রাস্তার আর দেখা নেই। আশেপাশে কোন বাড়িঘর এমনকি কোন লোকজনও চোখে পড়ছে না একেবারেই। এদিকে প্রায় ঘন্টাখানেক হয়ে গেছে। এবারে আমি কিছুটা ঘাবড়ে গেলাম। একা গাড়িতে সাথে আবার এক সুন্দরী তরুনী। কত রকম বিপদের ভয় এমন নির্জনে। রাত বাড়ার সাথে সাথে কুয়াশা বাড়ছে। কখনও কখনও কুয়াশার মেঘ রাস্তা ঢেকে ফেলছে, দশ হাত সামনেও কিছু ঠাহর করা যাচ্ছে না। তরুনী চোখ বড় বড় করে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। বেশ সন্ত্রস্ত মনে হচ্ছে ওকে এখন। আমিও বেশ চিন্তিত, তবে ওকে বুঝতে দিচ্ছি না কোনভাবেই। বার বার অভয় দিচ্ছি, আর আধাঘন্টার ভেতরই শহরে পৌঁছে যাবো, এসব বলছি।

 

একটা বাঁক পার হওয়ার পর হুট করেই রাস্তার দৃশ্যপট বদলে গেল! এতক্ষণ দুপাশের ইপিল-ইপিল গাছের সারি সঙ্গ দিচ্ছিল, তা আর নেই। বেশ খানিক পর পর দুয়েকটা খেজুর গাছ আর দুপাশে বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত, উন্মুক্ত প্রান্তর। কোথাও কোন আলো নেই। কৃষ্ণপক্ষের রাতে আকাশের চাঁদটারও দেখা নেই। কিছুটা চলার পর কুয়াশা যেন আমার গাড়িটাকে একেবারে গ্রাস করে নিল। আস্তে আস্তে খুব সাবধানে চালাচ্ছিলাম।

 

হঠাৎ সামনে, রাস্তার পাশের পাশাপাশি দাঁড়ানো তিনটা খেজুর গাছের মাঝেরটার গোড়ায় মনে হল একটা আগুনের কুন্ডলী যেন! গাড়িটা গাছের কাছে পৌঁছানো মাত্র ধুসর ধোঁয়ায় যেন অন্ধকার দেখলাম সামনে। আচমকা একটা ঝাঁকি লেগে গাড়ির সামনে চাকা দুটো যেন কিছুটা শুন্যে উঠে গেল! তরুণী -- বলে জোরে একটা চিৎকার দিয়ে আমাকে জাপটে ধরল। গাড়ির ইঞ্জিনটা খক-খক করে দুবার কাশি দিয়ে বন্ধ হয়ে গেল। শুধু তাই না, ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে, হেডলাইট, ব্যাকলাইট এমনকি ড্যাশবোর্ডের সকল আলো একসাথে নিভে গেল। মনের সাথে রিতিমত যুদ্ধ করে এখনও আমি শক্ত আছি। বার বার মনে হচ্ছিল, আমি ভয় পেলে বড় বিপদ হবে। চাবি ঘুরিয়ে গাড়ির পাওয়ার অফ করে অন করার চেষ্টা করলাম। কোন রেসপন্স নাই। ড্যাশবোর্ডের আলোও জ্বলে না  ইঞ্জিনে পাওয়ারও আসে না। বুঝলাম কোন কারনে ব্যাটারী কানেকশন মিস করছে। নেমে দেখতে যেতে চাইলে তরুনী শক্ত করে ধরে রেখে বলল, আমাকে ছেড়ে নামবেন না, আমি মারা যাবো।  খেয়াল করে দেখি ভয়ে তার শরীরে কাঁপুনী দিচ্ছে। ভয় কাটাতে বাধ্য হয়েই তাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে রইলাম কিছুক্ষণ। ভীত-সন্ত্রস্ত  মায়া হরিণীর মত কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগলো সে। কাঁপুনীর সাথে সাথে যেন অদ্ভূত মায়াবী গন্ধ আমার অলঅ্যাক্টরী লোব হয়ে মস্তিস্কের নিউরন থেকে নিউরনে, সমস্ত তন্ত্রীতে ছড়িয়ে পড়ছিল। ঘোর লাগা ছায়াচ্ছন্ন একটা অনুভূতি আমায় গ্রাস করছিল যেন।  

 

এভাবে প্রায় মিনিট দশেক থাকার পর ইগনিশনে গাড়ির চাবি ঘোরালাম। আমাকে অবাক করে দিয়ে গাড়ির ইঞ্জিন চালু হয়ে গেল। চলতে শুরু করলাম আবার। তরুনী আমার বামহাতটা শক্ত করে দুইহাতে চেপে ধরে আছে। ছোট বাচ্চারা ভয় পেলে যেমন করে, ঠিক তেমনই। আমি তাকে সাহস জোগাচ্ছি, আরে বোকা মেয়ে, ইউনিভার্সিটিতে পড়ো এখন এত ভয় পেলে চলে। মিনিট দশেক চলার পর একটা ছোট বাজার মত পড়ল। একটাই মাত্র চায়ের দোকান খোলা, তবে কোন ক্রেতা নাই। দোকানদার দোকান বন্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমাদের গন্তব্য বলে পথের হদিস চাইলাম। সে খুব অবাক হয়ে বলল, কোথা থেকে আসছেন এত রাতে?

 

আমার উত্তর শুনে খুব দুঃখ প্রকাশ করলেন। আমরা পথ ভুলে আবার সীমান্ত এলাকায় চলে গেছি। আর কয়েক কিলোমিটার পরেই পাশের দেশের কাঁটাতারের বেড়া। উনি রাস্তা বুঝিয়ে দিলেন সহজ করে। আমরা ওনাকে ধন্যবাদ দিয়ে রওনা হলাম। প্রায় ঘন্টা খানেক পথ চলার পর বড় রাস্তার দেখা পেলাম আর জানে পানি পেলাম যেন। এখন চেনা পথ, রাস্তায়ও ট্রাক বাস চলছে। বিপদ আপদে সাহায্য পাওয়া যাবে মানুষের।

 

এতটা যে পথ ভূলে ভোগান্তিতে পড়লাম, ভুতের ভয়ে সহযাত্রী দিশেহারা হয়ে পড়লো কিন্তু হাতের স্মার্ট ফোন কোন হেল্প করেনি সে রাতে আমাকে। যতবার ডাটা অন করেছি, নো নেটওয়ার্ক এভেইলএবল দেখিয়েছে। হয়তো সীমন্তবর্তী এলাকায় সিগনাল কম দেয়া থাকে। তাই এমনটা হয়েছে। গুগল ম্যাপ এর হেল্প নিতে পারিনি এক বারের জন্যও। শহরে পৌঁছে যতক্ষণে তার হোষ্টেলের সামনে গাড়ি দাঁড় করালাম ততক্ষণে তারিখ বদলে পরদিন হয়ে গেছে। রাত বারোটা পেরিয়েছে বেশ আগেই। তার রুমমেট দের ফোনে ডেকে, কেয়ারটেকার কে ঘুম থেকে জাগিয়ে তার রুমে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হল।

 

বাড়ি ফিরে বিছানায় কম্বলের নিচে আশ্রয় নিয়ে আবারও ভাবতে বসলাম কি এক স্মরনীয় আর রহস্যময় অর্ধেক রাত পার করে আসলাম আজ! কেন গাড়ির স্টার্ট বন্ধ হলো? সামনের দুইটা চাকাই কেন একসাথে মাটি থেকে উপরে উঠে গেল? কেনই বা ড্যাশবোর্ডের সকল আলো হেডলাইট সব একসাথে নিভে গেল? আবার কেনই বা মিনিট দশেক পর একাই চালু হলো? এসবের যৌক্তিক উত্তর হয়তো ঠিকই পাওয়া যাবে। অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে খুঁজলে। কিন্তু আমার মন উত্তর খুঁজতে সায় দিল না। থাক না কিছু রহস্যময় ভালো লাগা মুহুর্ত। কম্বলের সাথে লেপ্টে থাকুক মায়াবী গন্ধটা সারারাত।

 

তারপর, বেশ অনেকটা সময় কেটে গেছে। শীত পেরিয়ে এসেছে বসন্ত, বসন্ত গড়িয়ে গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরৎ। এখনও তরুণীর সাথে কথা হয়, টুংটাং শব্দে মেসেজ চালাচালি হয়, হয় নানান ইমোজির বিনিময়। সে আমার শরীরের বালক গন্ধের স্তুতি করে, শক্তি চট্রোপাধ্যায়ের কবিতা শোনায় কৃষ্ণপক্ষের ঘুম হারানো রাতে। কোজাগরী পূর্ণিমায় আমি তাকে জঙ্গলের গল্প বলি, ঝিঁঝিঁ পোকার গান শোনাই। এখনওহুট করেই অবচেতন নিউরনেরা মিছিল করে তার সেই আশ্চর্য মায়াবী শরীরি গন্ধটাকে আমার ব্রেইনের সমগ্র শিরা উপশিরায় বইয়ে দেয়।

 

মন বলে, সে তো সাথেই আছে। সবসময়ই আছে।

 

 



 

Comments

Popular posts from this blog

Hitting the Gym after Office — My Real-life Experience

Since last year, I’ve been forgetting things more often in my daily life

জঙ্গল পেরিয়ে দুধসাগর ফলসে