জঙ্গল পেরিয়ে দুধসাগর ফলসে
ধারণা করা হয়, উঁচু থেকে পড়ার কারণে পানি একেবারে দুধের মত সাদা দেখায় বলে এই জলপ্রপাতের নাম হয়েছে দুধসাগর ফলস
‘ভগবান মহাবীর ন্যাশনাল ফরেস্ট’ নামের একটি বড় বন পেরোতে হবে আমাদেরজলপ্রপাতে পৌঁছাতে।তাই গাইড জঙ্গলে কী কী করা যাবে না তা বারবার স্মরণ করিয়ে দিলেন। যেমন, প্লাস্টিক বা পলিথিন ফেলা যাবে না, জোরে চিৎকার করা যাবে না, কোনো বন্যপ্রাণীকে খাবার দেওয়া যাবে না, উজ্জ্বল রঙের পোশাক ও কড়া সুগন্ধী ব্যবহার করা যাবে না ইত্যাদি।
আমরা দলেবলে ছয়জন। বাংলাদেশ থেকে চার বন্ধু এসেছি। গন্তব্য এক হওয়ায় এখানে আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন আমেরিকান নাগরিক মিস অ্যানা ও মিস জিয়া। সঙ্গে দুজন গাইডও দেওয়া হয়েছে। একজন দলটির সামনে, একজন পেছনে।
এ জলপ্রপাতের একটি বড় আকর্ষণ এর ধার দিয়েই চলে গেছে রেলপথ। জলপ্রপাতের সামনে দিয়ে ট্রেন যাওয়ার দৃশ্যটা ক্যামেরাবন্দি করতে পারলে তো একেবারে কেল্লাফতে। প্রথমে প্রায় তিন কিলোমিটার দুধসাগর পাসের যে রেলপথ সেটা ধরে চললাম।
জুলাই মাসের সকালে কখনও রোদ, কখনও বৃষ্টি মাথায় নিয়ে আমাদের ছোট্ট দলটি হেঁটে চলছিল নানা রকম গল্প আর আড্ডায়। পথে নাম না জানা নানা পাখির ডাক আর কখনও কখনও লম্বা হুইসেল বাজিয়ে চলে যাওয়া রেলগাড়ির শব্দ কানে এল। গাইডের কথায় রেলপথ থেকে একটু নেমে দর্শনলাভ করলাম জঙ্গলের ভেতর প্রাচীন আমলের পর্তুগিজ বাড়ির।
ট্রেইল কোথাও বেশ খোলামেলা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন, কোথাও বা একদম সরু হয়ে চলে গেছে ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। কখনও আবার হাত দিয়ে বুনো ঝোপ সরিয়ে পথ বের করে তবেই আমাদের এগোতে হচ্ছে। ট্রেইলে বেশ কয়েকটা পাথুরে ঝিরি পড়ল। এর ভেতর দু-একটা খরস্রোতা। একটা ঝিরিতে এত স্রোত যে, দুপাশের গাছের সঙ্গে বাঁধা মোটা লতার দড়ি ধরে ধরে পার হতে হলো। তীব্র স্রোত পায়ের নীচ থেকে পাথর সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল এই বুঝি আমাকেও টেনে নিয়ে যাবে।
সেই স্রোতের টানে একজন মার্কিন পর্যটক পানিতে পড়ে গেলেন। তবে বড় বিপদ হওয়ার আগেই দুই গাইড দক্ষতার সঙ্গে তাকে উদ্ধার করলেন।
একপর্যায়ে দূর থেকে জলপ্রপাতের পানি পতনের শব্দ শুনলাম। যত ফলসের কাছাকাছি আসছিলাম তত পানির গর্জন বাড়ছিল। কখনও চড়াই কখনও উতরাই পেরিয়ে যখন জলপ্রপাতটির একেবারে কাছে, তখন ঘটলো আরেক অঘটন! গাছের উপর থেকে চার-পাঁচটি হনুমান নেমে এল। হঠাৎ একটা হনুমান আমার এক বন্ধুর দুপুরের খাবারের প্যাকেটটা নিয়ে দৌড়ে গাছের উপর উঠে গেল।
বাধ্য হয়ে বেচারাকে আমাদের সঙ্গে দুপুরের খাবার শেয়ার করে খেতে হলো।
অবশেষে যখন ফলসের নিচে পৌঁছলাম তখন দুচোখে কেবলই বিস্ময় আর মুগ্ধতা। ৩২০ মিটার অর্থাৎ ১০১৭ ফুট ওপর থেকে আছড়ে পড়ছে সীমাহীন জলরাশি। ধারণা করা হয়, উঁচু থেকে পড়ার কারণে পানি একেবারে দুধের মত সাদা দেখায় বলে এই জলপ্রপাতের নাম হয়েছে দুধসাগর ফলস। তবে এর নামকরণ নিয়ে স্থানীয় একটি মিথও আছে।
লোকমুখে প্রচলিত, প্রাচীনকালে এই জলপ্রপাতের জায়গায় ছিল এক রাজপ্রাসাদ। প্রাসাদের সরোবরে রাজকুমারী গোসল সেরে সোনার পাত্রে দুধ পান করতেন। একদিন ওই রাজকুমারীকে স্নান করার সময় নগ্ন অবস্থায় দেখে ফেলেন এক রাজকুমার। নিজেকে আড়াল করার জন্য সোনার পাত্রে রাখা দুধ নিজের গায়ে ঢেলে ফেলেন রাজকুমারী। সেই দুধই এখন জলপ্রপাতের মতো নেমে আসে পাহাড় বেয়ে।
জঙ্গল ট্রেইলে যেতে যেতে দেখা পেলাম বড় ধনেশ পাখি (গ্রেট হর্নবিল) এবং বড় আকারের বাদামি কাঠবিড়ালির। বুনো বাইসনের পায়ের ছাপও মিলল। ফেরার পথে আবার ১০ কিলোমিটার বুনো পথ এবং রেললাইন ধরে হেঁটে যখন দ্য জঙ্গল বুকে পৌঁছলাম ততক্ষণে সূয্যিমামা ডুব দিয়েছেন।
ভারতে পৌঁছে প্রথম উড়োজাহাজ বা ট্রেনে যাবেন গোয়ায়। গোঁয়ার ভাস্কো দা গামা রেলস্টেশন কিংবা এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সি ভাড়া করে ট্রাভেল এজেন্সির অফিস। আমাদের এজেন্সির অফিস ছিল জঙ্গলের কাছেই। বাকি দায়িত্ব তাদের।
https://www.deshkalnews.com/details/feature/6084






Comments
Post a Comment