নখ রঞ্জনী
দ্রুত ধাবমান ট্রেনটা হঠাৎ করেই গতি হারিয়ে ধীরে ধীরে থেমে গেল একটা বহু পুরনো পরিত্যক্ত রেলষ্টেশনে। যার ক্ষয়িষ্ণু প্লাটফরমে বসানো কংক্রিটের বেঞ্চিগুলো কংকাল বের করে ঠাঁই বসে আছে শেষ দিনগুলোর অপেক্ষায়। যাত্রীরা উসখুস করতে করতে নেমে দাঁড়াল পাশের বিরাটাকার অশ্বথ গাছটার নিচে। মিনিট কুড়ি পর রেলের গার্ড সাহেবের কাছ থেকে খবর এল সামনের ষ্টেশনে আরেকটা ট্রেনের ইঞ্জিনে আগুন লাগায় আপাতত সব ট্রেন থেমে থাকবে যে যেখানে আছে।
গল্পের নায়ক চন্দন ট্রেন থেকে নেমে গেল বেশ খুশি মনেই। বড় শহরে যাবে সে, তবে যেখানে ট্রেন থেমেছে তার খুব কাছের ক্ষুদে মফঃস্বল শহরেই যে কেটেছে তার কৈশর যৌবনের আগুন জ্বলা সব দিন। বর্ষার ভরা নদীতে রেল ব্রিজের পিলারের উপর থেকে বন্ধুদের সাথে ঝাঁপ দিয়ে ডুব-সাঁতার খেলা। পাশের গ্রামের সুনয়নাকে দেখতে বালিকা বিদ্যালয়ের সামনে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থেকে দেরীতে ক্লাসে ঢোকায় ক্লাস টিচারের কাছে পিটুনি খাওয়া। এমনই সহস্র স্মৃতি হুট করেই উঠে এল মস্তিষ্কের কোষে কোষে। একটা রাত বা সন্ধ্যা এখানে কাটিয়ে যেতে পারলে দারুণ হত কিন্তু আগামীকাল যে ইউনিতে ওর ব্যাচের রিইউনিয়ন। সকালের মধ্যেই পৌঁছাতে হবে তাকে।
এতসব ভাবতে ভাবতেই এক বাইকওয়ালাকে অনুরোধ করে সেই মফঃস্বল শহরের বাস টার্মিনালে পৌঁছাল বাসের সন্ধানে। কাউন্টারে গিয়ে বেশ অবাকই হল সে, ওর স্কুলের এক বন্ধু একটা বাসের কাউন্টার মাষ্টার। পরের গাড়িতে একটা সিট খালি আছে কিন্তু পাশের যাত্রী নারী হওয়ায় সিটটা কোন নারী যাত্রীকে দেয়ার অনুরোধ ছিল। কিন্তু বন্ধুর বিপদ দেখে সিটটা ওকে দিয়ে কাউন্টার মাষ্টার বন্ধু বার বার স্মরণ করিয়ে দিল, বিকেলের বাস গন্তবে্য পৌঁছাতে বেশ রাত হবে। পাশের নারী সহযাত্রীর যেন কোন অসুবিধা না হয়। যে নারী সহযাত্রীর কথা হচ্ছে তিনি কিন্তু কাউন্টারে আসেননি, তিনি উঠবেন আরও কিলো পাঁচেক সামনে থেকে। বেশ কৌতুহল বোধ করল ও।
যথা সময়ে গাড়ি ছাড়ল। শ্রাবনের বিকেলে যার্নিটা বেশ উপভোগ করার মত। হঠাৎ ছোট একটা মোড়ে বাসটা থেমে গেল আর পলাশ রাঙা লাল জামা পরে এক সুবেশী তরুনী উঠে এল গাড়িতে। প্রথম সারির সিট হওয়ায় আস্তে করে গিয়ে জানালার পাশে চুপচাপ বসে গেল। হর্ণ বাজিয়ে, অন্য গাড়িকে পেছনে ফেলে ছুটছে গাড়িটা হাইওয়ে ধরে। তখন বিকেল, বেশ ঝকঝকে আকাশ কিছু সাদা মেঘ ইতিউতি উড়ে বেড়াচ্ছে। তরুনীর খোলা চুল প্রায়ই বাতাসে উড়ে এসে ওর নাকে মুখে ছুঁয়ে যাচ্ছে। আচমকা তরুণী চুলগুলো খোপা করে ক্লিপে আটকে দিল। যুগপৎ বিরক্তি আর ভালোলাগাটা হারাল হঠাৎই।
তরুনী একটু নড়েচড়ে বসে নিজের হাতব্যাগ থেকে একটা নীলরঙা নেইলপলিশ বের করে পায়ের নখে লাগানো শুরু করল। খুব যত্ন করে নেইলপলিশ লাগাচ্ছিল সে। দারুণ সুন্দর পা জোড়ার একটা পাতা হাঁটুর উপর তুলে এক একটা আঙ্গুলের নখে সে যখন নেইলপলিশ লাগাচ্ছিল, ওর খুব মন চাইছিল পায়ের আঙ্গুলগুলো ছুঁয়ে দিতে। কল্পনায় তো ঐ জ্বলজ্বলে নীলরঙা নখগুলোর উপর নিজের ওষ্ঠই বুলিয়ে দিল মনে মনে।
ভাবনার জগৎ থেকে বের হযে ও কথা শুরু করল হালকা চালে, নেলপলিশ এর রঙটা তো খুব সুন্দর।
হ্যাঁ, এটা আমার পছন্দের রঙ, মৃদু হেঁসে তরুণীর উত্তর।
তারপর। বাস চলল, কথাও চললো। সদ্য বিবাহিত তরুণীর স্বামী শহরে চাকুরীরত আর সে নিজেও পিত্রালয়ের কাছেই একটা গ্রামের স্কুলের শিক্ষক। পথে গাড়িটা থামল একটা হাইওয়ে রেস্টুরেন্টে। একসাথে নামা হল, কফি পান হল আধো আলো তে ওদের গল্পও এগোল। প্যানডোরার বক্সের মত যেন কথার ঝাঁপির মুখটাই খুলে দিল তরুনী।
সমগ্র যাত্রাপথে শৈশব থেকে বর্তমান অবধি সঙ্গী হয়ে ভ্রমণ করিয়ে নিল সে। যেন এক যাত্রায়ই হয়ে গেল বড় আপন, খুব কাছের কেউ। সংকোচহীন দুটি হৃদয় যেন স্মৃতির সকল সরনিতে ঘুরে ঘুরে বড় একটা মানসভ্রমণ সেরে নিল।
দীর্ঘ ক্লান্তিকর রাস্তাটা সেদিন যেন এক নিমেষেই শেষ হল। গাড়িটা এসে যখন শেষ স্টপেজে দাঁড়াল। নিচ থেকে সদ্য বিবাহিত তরুনীর স্বামী প্রবর হাত ইশারায় ডাকলেন।
আসন ছাড়ার আগে মৃদু গলায় ছোট্র করে বলে গেল, নীল নেইল পলিশ যতবার পরবো আপনার কথা মনে পড়বে আর আজকের এই জার্নির কথা।
নেমে যাওয়ার ঠিক আগে গাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে মরাল গ্রীবা বাঁকা করে একটা মোহনীয় হাঁসি টেনেই নেমে গেল সে।
ঠোঁট থেকে চোখ পর্যন্ত হেঁসে ওঠা অপূর্ব সুন্দর সেই হাঁসিটা আজও ওর মনে জ্বলজ্বলে স্মৃতি হয়ে দোলা দেয়। বাসে বা ট্রেনে। দূরের যাত্রায়।

Comments
Post a Comment