মান্ডোভী নদীর মোহনায় ফোর্ট আগুয়াদার প্রাচীন প্রাচীরে
প্লেনটা তখন নামার প্রস্ততি নিচ্ছে। ক্যাপ্টেনের নির্দেশ পেয়ে সকলেই সিটবেল্ট বেঁধে রেডি। হঠাৎ করেই বেশ জোর একটা ধাক্কায় মনে হল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিচে পড়ছি আমরা। এর মাঝেই ককপিট থেকে পাইলটের সহাস্য উক্তি, "We are dancing in the air now, little bit later we will dancing on the beach." ভারতের গোয়া রাজ্যের আরব সাগরের পাড়ের একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ডাবোলিম এর আকাশে তখন আমরা। বেশ ঝড়ো হাওয়া বইছে উপরে তাই এমন ঝাঁকি। তবুও যাত্রীরা ভয় নয়, বেশ আমোদই পেল যেন। সবাই হো হো করে হেঁসে দিল নিজের আসনে বসেই। কালো মেঘ, ধুসর মেঘ, সাদা মেঘের সব স্তর পার হয়ে বিমানের চাকা যখন রানওয়ে স্পর্শ করল তখনও বেশ বাতাস আর ঝিরিঝিরি বৃষ্টি বাইরে।
এয়ারপোর্ট থেকে চেক আউট করে বেশ অনেকটা পথ হেঁটে এসে টাউন সার্ভিস লোকাল বাস ধরেছিলাম আমরা। ভিন দেশের কত বিচিত্র মানুষজন সঙ্গী হয়েছিল সে যাত্রায়। সবুজ বনস্থলীর বুক চিরে বানানো কালো পিচে মোড়া মসৃন রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে চোখে পড়ছিল বন-বনানীতে ভরপুর এক স্বপ্নরাজ্য। আর এমনই তো হবে, কারণ এই গোয়া রাজ্যের স্থলভাগের প্রায় ষাট শতাংশই যে বনভূমি।
কালাংগুট গ্রামের দ্বীতল হোমস্টে তে যখন পৌছলাম ততক্ষণে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমেছে সাগর সঙ্গমে। পরদিন খুব সকালেই আগের রাতে ঠিক করে রাখা আমাদের গাড়ির ড্রাইভার অমিতজি এসে ঘুম ভাঙিয়েছিলেন আমাদের। পথ পাশের পরিচ্ছন্ন টং দোকানে এগ-ভুর্জি আর পরোটা দিয়ে প্রাতরাশ সেরে আমরা বেরিয়েছিলাম সেদিনের সাইট সিয়িং এ।
সাদা রঙের ছোট্র সুন্দর সুজুকি ডিজায়ার গাড়িটা আঁকাবাঁকা মসৃন কালো পিচের পথ ধরে চলছিল দুরন্ত গতিতে। কখনও এক পশলা ঝুম বৃষ্টি, কখনওবা সমুদ্র থেকে উঠে আসা নোনা বাতাস গাড়ির জানালা গলে ঢুকে পড়ছিল ভেতরে। পথের বাঁকে হঠাৎই চোখে পড়ছিল আরব সাগরের ঘোলা জল আর তার উপর ঝুলে থাকা ঘোলাটে মেঘেরা বাতাসে ভেসে যেন মিশে যাচ্ছিল দিগন্ত রেখায়।
বেশ খানিকটা পর সবুজ গাছপালার উপর দিয়ে একটা ধবধবে সাদা গম্বুজ চোখে ধরা দিল। দেখতে দেখতেই আমরা চলে এলাম গাড়ি রাখার সবুজ চত্বরে। হাতের ডান পাশেই বিশাল জায়গা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে চার শতাব্দীরও বেশি প্রাচীন পর্তুগীজ দূর্গ- ফোর্ট আগুয়াদা। রাস্তা পেরিয়ে দূর্গের প্রবেশ দ্বারেই চওড়া লাল ইটের প্রচীর যেন এক ঐতিহাসিক মহাকাব্যের প্রথম পরিচ্ছেদ হয়ে স্বাগত জানাল।
আজ থেকে চারশ বছর আগে ১৬১২ সালে নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছিল এই দূর্গের। প্রথমে পর্তুগিজ কলোনির প্রতিরক্ষার জন্য তৈরি হলেও পরবর্তিতে সমুদ্রগামী জাহাজে পানি সরবরাহ, লাইট হাউজ তৈরি করে জাহাজকে পথ দেখানো সহ রাজনৈতিক বন্দীদের কারাগার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে এই দূর্গ । পর্তুগিজ ভাষায় “আগুয়াদা” শব্দের অর্থ ’পরিষ্কার পানি’ । দূর্গে থাকা তিনটি সুপেয় পানির উৎস থেকে জাহাজের নাবিকেরা পানি সংগ্রহ করত তাই এই দূর্গের নাম হয়েছে ফোর্ট আগুয়াদা।
মূল দূর্গের অবকোঠামো শক্ত পাথরে নির্মিত তাই আজও এটা সুদৃঢ় ভাবে টিকে আছে। এই দূর্গে নির্মিত লাইটহাউজটি ১৮৬৪ সালের যা এশিয়ার প্রাচীনতম লাইটহাউজগুলোর মধ্যে অন্যতম। পর্তুগিজ আমলে এই দূর্গে ৭৯ টি কামান স্থাপন করা হয়েছিল বহিঃশত্রু মোকাবিলায়। দূর্গের ভেতরে বন্দীদের সেল, গোলাবারুদ কক্ষ ছাড়াও আছে গোপন সুড়ঙ্গ। যেখান দিয়ে নিরাপদে জাহাজ রাখার জায়গাতে চলে যাওয়া যায়।
দূর্গের ওপর থেকে নিকটতম সৈকতগুলো নয়নাভিরাম দৃশ্য হয়ে ধরা দেয় মানস চোখে। আমরা দূর্গের ওপর হেঁটে বেড়ানোর সময় একটা হেলিকপ্টার রুটিন ডিউটিতে খুব নিচু দিয়ে চক্কর দিচ্ছিল সমুদ্রের ওপর, আর তাতেই দারুণ এক দৃশ্যের অবতারনা হচ্ছিল তখন।
ফোর্ট আগুয়াদা বর্তমানে যাদুঘর হিসেবে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত। সকাল ৯.০০ থেকে সন্ধ্যা ৬.০০ পর্যন্ত খোলা থাকে। ডাবোলিম তথা গোয়া আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দর থেকে মাত্র ৪০ কিমি দূরে অবস্থিত ফোর্ট আগুয়াদা যেতে ভাড়ার ট্যাক্সি কিংবা রেন্টাল বাইক নিতে পারেন। অথবা নিকটবর্তী শহর গোয়ার রাজধানী পানজিম তথা পানাজি থেকে ১৫ কিমিঃ স্কুটি বা বাইক নিয়েও চলে আসতে পারেন। আর আপনি যদি আমাদের মত ক্যান্ডোলিম বা বাগা সমুদ্র সৈকতের কাছাকাছি থাকেন তাহলে খুব সহজেই গাড়ি, বাইক বা স্কুটি নিয়েই দেখে আসতে পারবেন প্রাচীন এই স্থাপনা। আর সেই সাথে ইতিহাসের পথ ধরে পৌঁছে যাবেন চারশত বছরের পুরনো কোন মধ্যদুপুরে কিংবা ঘোর লাগা সন্ধ্যাবেলায়।



Comments
Post a Comment