সন্ধ্যার প্রাসাদে অতীতের প্রতিধ্বনি
সাপ্তাহিক ছুটির দিনে মধ্যাহ্ন ভোজনের পর ভাতঘুমের সুখটাকে শিকেয় তুলে দুই চাকার যন্ত্র শকটের পিঠে চেপে বসেছিলাম প্রিয় ভ্রমণ সঙ্গীনির সাথে। হলদে-সবুজ মাখা সদ্য শীষ বেরনো অবারিত ধান ক্ষেতের মাঝে সর্পি ল পিচ ঢালা রাস্তায় চলেছিলাম আমরা মাথার উপর শিরিষ, কড়ই আর ইপিল-ইপিল এর আলোছায়া মেখে। সূয্যিমামা কখনও তীব্র আলো ছড়াচ্ছেন, কখনওবা বিশাল একখন্ড মেঘের আড়ালে লুকিয়ে বক্রাকার আলোক রেখা হয়ে অস্তিত্ত্ব জানান দিয়ে চলেছেন। আলমডাঙ্গার পুরাতন লাল-ব্রিজ পার হয়ে কুমারি গ্রামের প্রাচীন প্রাসাদে পৌছতেই বেলা প্রায় পড়ে এল।
সামনের বিশালাকার রেইনট্রি আর বোতল ব্রাশ এর পাতার ফাঁক গলে আসা ক্লোরোফিল ধোয়া সবুজ আলো যেন অলস আটকে গিয়েছিল বারান্দার কাল মেঝেয়। আর বন্ধ দরজার ওপার থেকে ফিসফিসানি ধ্বনির সাথে ভেসে আসছিল পুরাতন দিনের জমিদারীর হাঁকডাক আর পুজা-অর্চনার টুং-টাং ঘন্টাধ্বনি। এককালে হয়তো দোতলায় দক্ষিণের শেষ কামরা থেকে গভীর রাতে ভেসে আসতো বিষন্ন রাজকণ্যার খালি গলায় গাওয়া গান, কখনওবা হাসির ঝংকারে, নুপুরের নিক্কণে মুখর থাকত এই দালান -- আজ সেসব কেবল নৈঃশব্দের প্রতিধ্বনি হয়েই আটকে আছে কড়ি বর্গার ফ্রেমে কিংবা চুন-সুরকির পুরু আস্তরণে।
কথিত আছে এই জমিদার বাড়ির সামনে দিয়ে কেও জুতা /সেন্ডেল পরিধান করে হাঁটতে পারতো না । হাঁটলে সাজা দেওয়া হতো। গ্রীক স্থাপনা কৌশল অনুসরণ করে নির্মাণ করা হয়েছে জমিদারবাড়িটি। এ বাড়ির নির্মাণকারী এবং নির্মাণ সালের সঠিক ইতিহাস জানা যায়নি । নির্মাণশৈলী দেখে অনুমান করা যায়, এটি নাটোরের জমিদারবাড়ির সমসাময়িক সময়ে নির্মাণ করা হয়েছে। অর্থাৎ উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে নির্মাণ হয়ে থাকতে পারে। কুষ্টিয়া জেলার আমলা সদরপুরের সাহা জমিদারদের মুহাম্মদ শাহী পরগনার একটি মহলের চারআনা জমিদারির মালিক ছিলেন কৃষ্ণবিহারি সাহা। এই সাহা বংশের শেষ জমিদার ছিলেন কৃষ্ণবিহারির বড় ছেলে উপেন্দ্রনাথ সাহার ছেলে শৈলেন্দ্রনাথ সাহা।দেশভাগের পর ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলোপ হলেও শৈলেন্দ্রনাথ সাহা এই কুমারী গ্রামেই বসবাস করতেন। তখনও তাঁর বাড়ি, বাগান ও পুকুর নিজের অধিকারেই ছিল। ১৯৬০ সালের দিকে তিনি বাড়ি ও পুকুর পরিত্যাগ করে কলকাতায় চলে যান।
দুইটা গভীর কুপ রয়েছে। তাছাড়া শান বাধানো নজরকাঁড়া পুকুর রয়েছে। পুকুরপাড়ে রয়েছে নাম না জানা বিরল প্রজাতির বৃক্ষ। জমিদার বাড়ির নারীদের গোসলের জন্য পুকুর ঘাটের দুইপাশ উঁচু করে বাঁধানো হয় নান্দনিকভাবে । সেই সিড়ি নেমে গেছে পুকুরের পানি অবধি। শোনা যায় একসময় লখনৌ - বেনারস থেকে বাইজি আসতো, বসতো জলসা।
বাস বা ট্রেন যোগে চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলা সদরে পৌঁছে খুব সহজেই রিকশা বা ইজিবাইক নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন ইতিহাসের এই অদেখা অলিন্দে।

Comments
Post a Comment